ঐতিহ্যবাহী কফি হাউসে জয় জগন্নাথের আবাহন:-
বৈচিত্র সভাঘরে ভাষাচয়ন প্রকাশনের ‘আন্তর্জাতিক জগন্নাথ সংখ্যা ২০২৬’-এর ঐতিহাসিক মহাপ্রকাশ -নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা :কলকাতার ঐতিহ্যবাহী কলেজ স্ট্রিট কফি হাউসের বইচিত্র সভাঘরে ভক্তি, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও সৃষ্টিশীলতার এক অপূর্ব মিলনমেলার মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত হল ভাষাচয়ন প্রকাশনের ‘আন্তর্জাতিক জগন্নাথ সংখ্যা ২০২৬’-এর মহাপ্রকাশ অনুষ্ঠান।

কবি, সাহিত্যিক, শিল্পী, সাংবাদিক, সমাজকর্মী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠানটি হয়ে ওঠে এক স্মরণীয় আয়োজন।জাতীয় সংগীত ও প্রদীপ প্রজ্বলনের মধ্য দিয়ে শুভ সূচনাজাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের শুভ সূচনা হয়। এরপর মহাপ্রভু জগন্নাথের চরণে শ্রদ্ধা নিবেদন করে প্রদীপ প্রজ্বলনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে সূচনা করা হয় ‘আন্তর্জাতিক জগন্নাথ সংখ্যা ২০২৬’-এর মহাপ্রকাশ অনুষ্ঠানের। প্রদীপের আলোকশিখায় যেন ভক্তি, সাহিত্য ও সংস্কৃতির এক নতুন পথচলার সূচনা ঘটে।জগন্নাথদেবের প্রতি ভক্তি, নীলাচলের মাহাত্ম্য, রথযাত্রার স্মৃতি এবং মানুষের আবেগকে কেন্দ্র করে প্রকাশিত এই বিশেষ সংখ্যায় কবি-সাহিত্যিকদের নিজস্ব সৃষ্টিকে স্থান দেওয়া হয়েছে। তাঁদের সৃষ্টির স্বীকৃতি হিসেবে অনুষ্ঠানে ৫০ জন কবিকে পৃথক পৃথক ক্যাটাগরিতে সম্মানিত করা হয়।বিশেষ অতিথিদের উপস্থিতিঅনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বরুণ চক্রবর্তী, কবি, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক; চিত্ররথ গুহ, বৈচিত্র সভাঘরের কর্ণধার ও সমাজসেবক; তুষারকান্তি রায়, বিশিষ্ট কবি ও সাহিত্যিক; মৃণাল কান্তি দাস, চিত্রকর, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মী এবং তিন দশকের সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ‘কুশাঙ্কুর’-এর কর্ণধার; ড. আকবর আলি শাহ, বিশিষ্ট সাহিত্যিক, ইতিহাস গবেষক ও অধ্যাপক এবং অমরেশ মুখার্জী, বিশিষ্ট কবি ও সাহিত্যিক।বিশেষ অতিথি নির্মাল্য বিশ্বাস, বিশিষ্ট চলচ্চিত্র পরিচালক, কথাসাহিত্যিক, সুরকার ও গীতিকার, বিশেষ কারণে অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে পারেননি।

তাঁর অনুপস্থিতি অনুভূত হলেও তাঁর ভালোবাসা ও আন্তরিকতা অনুষ্ঠানের সঙ্গে স্মরণীয় হয়ে থাকে।অনুষ্ঠানের সার্বিক আয়োজনে ছিলেন প্রধান উপদেষ্টা মনোরমা ঘোষ, কর্ণধার অমিত ঘোষ এবং সম্পাদিকা ও সঞ্চালিকা রনিতা মল্লিক।পূর্বনির্ধারিত প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নঅনুষ্ঠানের অন্যতম উল্লেখযোগ্য মুহূর্ত ছিল ‘আন্তর্জাতিক বৈশাখী সংখ্যা ২০২৬’-এর প্রথম স্থান অধিকারী পৌলমী শীল বিশ্বাসের একক গ্রন্থ প্রকাশ। পূর্বনির্ধারিত প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, ভাষাচয়ন প্রকাশন সম্পূর্ণ নিজস্ব খরচে তাঁর একক বই প্রকাশ করে।নতুন কবি ও সাহিত্যিকদের পাশে দাঁড়ানো এবং তাঁদের সৃষ্টিকে বৃহত্তর পাঠকমহলের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে এই উদ্যোগ বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানাধিকারীপ্রথম স্থান অধিকার করেন সব্যসাচী পন্ডিত। পুরীতে মহাপ্রভু জগন্নাথ দর্শনের জন্য তিনি পান পুরী যাওয়া ও আসার এক্সপ্রেস ট্রেনের টিকিট। পাশাপাশি একক বই প্রকাশের ক্ষেত্রে ভাষাচয়ন প্রকাশনের পক্ষ থেকে ৬০ শতাংশ সহযোগিতা দেওয়া হবে।দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেন অদ্বৈত নীল। তিনি পান দীঘায় জগন্নাথ দর্শনের জন্য যাওয়া ও আসার এক্সপ্রেস ট্রেনের টিকিট। একক বই প্রকাশের ক্ষেত্রে ভাষাচয়ন প্রকাশনের পক্ষ থেকে ৫০ শতাংশ সহযোগিতা দেওয়া হবে।তৃতীয় স্থান অধিকার করেন তুলিকা চক্রবর্তী। তিনি পান মায়াপুরে রাধারানী দর্শনের জন্য যাওয়া ও আসার খরচ। পাশাপাশি একক বই প্রকাশের ক্ষেত্রে ভাষাচয়ন প্রকাশনের পক্ষ থেকে ৫০ শতাংশ সহযোগিতা দেওয়া হবে।জগন্নাথ সংখ্যা ২০২৬-এর বিশেষ সম্মাননাঅনুষ্ঠানে কবি ও সাহিত্যিকদের তাঁদের মূল্যবান নিজস্ব সৃষ্টির জন্য বিভিন্ন স্বতন্ত্র নামে সম্মানিত করা হয়—১. শচী দুলাল পাল — ‘নীল মাধবের সন্ধানে’ — জগন্নাথ কাব্যবীণা সম্মান২. অদ্বৈত্য নীল — ‘দারুব্রহ্মের মহাতত্ত্ব’ — জগন্নাথ অগ্নিবীণা সম্মান৩. তাপস বাইন — ‘অপেক্ষা’ — জগন্নাথ কাব্যরাগ সম্মান৪. দেবস্মিতা ঘোষ — ‘জয় জগন্নাথ’ — জগন্নাথ কাব্য অনুরণন সম্মান৫. মৌমিতা দাশগুপ্ত — ‘দিব্যদৃষ্টি’ — জগন্নাথ কাব্যপল্লব সম্মান৬. তনুজা পন্ডিত — ‘ফ্ল্যাট বাড়ি’ — জগন্নাথ কাব্যপুষ্প সম্মান৭. পৌলমী শীল বিশ্বাস — ‘জগন্নাথ বন্দনা’ — জগন্নাথ কাব্যনিবেদন সম্মান৮. তুলিকা চক্রবর্তী — ‘নীলাচলের নীলমাধব’ — জগন্নাথ কাব্যভুবন সম্মান৯. কৃষ্ণারাম — ‘আমি বৃষ্টি হতে চাই’ — জগন্নাথ কাব্যশিখা সম্মান১০. মুনমুন চন্দ্র — ‘শৈশবের রথযাত্রা’ — জগন্নাথ কাব্যরাগিনী সম্মান১১. তন্ময় দত্ত — ‘হবেনা ফেরা’ — জগন্নাথ কাব্যস্পন্দন সম্মান১২. বিমলেন্দু বেরা — ‘রথযাত্রা’ — জগন্নাথ কাব্যতরঙ্গ সম্মান১৩. সুষমা বর্মন — ‘অনবাসরের কারণ’ — জগন্নাথ কাব্যজ্যোতি সম্মান১৪. রেবা ভৌমিক — ‘মেয়ে বেলাতে রথের মেলা’ — জগন্নাথ কাব্যাঞ্জলি সম্মান১৫. শচীদুলাল দাস — ‘জগন্নাথ’ — জগন্নাথ কাব্যশ্রী সম্মান১৬. মোঃ রাকেশ সেখ — ‘আষাঢ়ের বৃষ্টি’ — জগন্নাথ কাব্যস্মৃতি সম্মান১৭. লক্ষ্মী দাস — ‘একাকিত্ব’ — জগন্নাথ কাব্যকুসুম সম্মান১৮. অসীম কুমার দাস — ‘রথের মেলা’ — জগন্নাথ কাব্যনক্ষত্র সম্মান১৯. ড. রাজীব কর্মকার — ‘বুড়োবুড়ির রথযাত্রা’ — জগন্নাথ কাব্যচূড়া সম্মান২০. চিন্ময়ী দত্ত — ‘রথযাত্রা’ — জগন্নাথ কাব্যপ্রণাম সম্মান২১. কবি সুজিত সাধুখাঁ — ‘পুরীর টানে’ — জগন্নাথ নীলাচল কাব্য সম্মান২২. রাজীব দাশ — ‘ধ্রুব ধারাপাত’ — জগন্নাথ মহদধি কাব্য সম্মান২৩. রিম্পা হাইত — ‘শ্রাবণের বর্ষা’ — জগন্নাথ কাব্যপ্রণাম সম্মান২৪. দীরা (দীপঙ্কর রায়) — ‘জগৎ প্রভু’ — জগন্নাথ নীলচক্র কাব্য সম্মান২৫. শ্রীবরুণ — ‘পাগলী’ — জগন্নাথ শ্রীক্ষেত্র কাব্য সম্মান২৬. ড. রুনা দত্ত — ‘মেঘের চিঠি’ — জগন্নাথ নীলাদ্রি কাব্য সম্মান২৭. পার্থ বিজলী — ‘আজও ভুলিনি’ — জগন্নাথ জগবন্ধু কাব্য সম্মান২৮. সুলেখা চৌধুরী — ‘রথের মেলা’ — জগন্নাথ নীলদিগন্ত কাব্য সম্মান২৯. সৌগত পাত্র — ‘অনাথের সখা’ — জগন্নাথ রথরেণু কাব্য সম্মান৩০. দেবব্রত মজুমদার — ‘রথের দিনে’ — জগন্নাথ রথস্পন্দন সম্মান৩১. মহুয়া হই — ‘কালের যাত্রা’ — জগন্নাথ রথজ্যোতি সম্মান৩২. সোমা দাস — ‘রথের যাত্রা’ — জগন্নাথ সাগরতরঙ্গ সম্মান৩৩. পায়েল দাস — ‘গ্রামের মেলা’ — জগন্নাথ রত্নমালা সম্মান৩৪. ইলা দত্ত সিং — ‘জগন্নাথের রথযাত্রা’ — জগন্নাথ চন্দ্রকিরণ সম্মান৩৫. পঙ্কজ বিশ্বাস — ‘আবোল তাবোল রথের চাকা’ — জগন্নাথ চন্দ্রদিগন্ত সম্মান৩৬. অনিমা লেট — ‘অভিমানের দর্শন’ — জগন্নাথ অমৃতজ্যোতি সম্মান৩৭. মার্জনা গাঙ্গুলী — ‘নিঃশর্ত ভালোবাসা’ — জগন্নাথ প্রেমকুসুম সম্মান৩৮. রোদ্দুর — ‘বৃষ্টির শরীরে তোমার নাম’ — জগন্নাথ হৃদয়তরঙ্গ সম্মান৩৯. বিশ্বজিৎ ঘোড়াই — ‘বাবা তুমি অনেক ভালো থেকো’ — জগন্নাথ মহাকাব্যসুধা সম্মান৪০. অরিজিৎ ঘোষ — ‘একলা ঘরের মেঘমল্লার’ — জগন্নাথ সুধাপদ্ম সম্মান৪১. সব্যসাচী পন্ডিত — ‘মহাকালের অনিমেষ দৃষ্টি’ — জগন্নাথ প্রেমস্পন্দন সম্মান৪২. গৌতম বক্সী — ‘শুধু তোমাতেই ভাবিত’ — জগন্নাথ প্রেমাঞ্জলি সম্মান৪৩. ড. আকবর আলি শাহ — ‘কাঠের চাকার দর্শন’ — জগন্নাথ স্বর্ণকিরণ সম্মান৪৪. জয় মন্ডল — ‘বেহিসেবি ভালোবাসা’ — জগন্নাথ বসন্তস্মৃতি সম্মান৪৫. পল্টু কুমার মল্লিক — ‘প্রতিবাদী ভোর’ — জগন্নাথ কাব্যগৌরব সম্মান৪৬. স্বাগতা দত্ত — ‘ভক্তের মনিকোঠা’ — জগন্নাথ কাব্য মঞ্জুরী সম্মানবিশেষ সম্মাননাঅনুষ্ঠানে মোস্ট সিনিয়র পারসন জলি ব্যানার্জী, শিল্পী মিঠু ব্যানার্জী, ফটোগ্রাফার প্রদীপ্ত দাশগুপ্ত ও শুভঙ্কর দাস, এবং মুম্বই-খ্যাত মডেল দীপিকা হাজরা-কে বিশেষভাবে সম্মানিত করা হয়।এছাড়াও দুই খুদে নৃত্যশিল্পী পরিণীতা মল্লিক ও পরমজিত কৌর-কে তাঁদের প্রতিভা ও নৃত্যশৈলীর জন্য বিশেষভাবে সম্মানিত করা হয়। তাঁদের উপস্থিতি অনুষ্ঠানের সাংস্কৃতিক আবহকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে।মঞ্চে গান পরিবেশন করে অনুষ্ঠান মাতিয়ে রাখেন পল্টু কুমার মল্লিক। তাঁর সুরেলা পরিবেশনা উপস্থিত অতিথি ও দর্শকদের মন ছুঁয়ে যায় এবং অনুষ্ঠানের আবহকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে।অনুষ্ঠানের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত লেন্সবন্দি করেন শুভঙ্কর দাস।প্রধান উপদেষ্টা মনোরমা ঘোষ বলেন—“সাহিত্য মানুষের হৃদয়ের কথা বলে। আজ যাঁরা সম্মানিত হলেন, তাঁদের প্রতিটি সৃষ্টির প্রতি রইল আমার ভালোবাসা ও আশীর্বাদ। জগন্নাথদেব সকলের সৃষ্টিশীল পথকে আলোকিত করুন।”কর্ণধার অমিত ঘোষ বলেন—“শুধু বই প্রকাশ নয়, নতুন প্রতিভার পাশে দাঁড়ানোই ভাষাচয়নের মূল উদ্দেশ্য। একজন সৃষ্টিশীল মানুষকে সম্মান দেওয়া মানে তাঁর কলমকে আরও একবার সাহস দেওয়া।”সম্পাদিকা ও সঞ্চালিকা রনিতা মল্লিক বলেন—“এই মঞ্চ শুধু কবিতার নয়, মানুষের স্বপ্ন ও সৃষ্টির মিলনমঞ্চ। তাঁদের পাশে থাকতে পারাটাই আমাদের সবচেয়ে বড় আনন্দ।”পরিশেষে ভক্তি, সাহিত্য, সঙ্গীত ও সংস্কৃতির এই অনন্য মিলনমেলার মধ্য দিয়ে ‘আন্তর্জাতিক জগন্নাথ সংখ্যা ২০২৬’ ভাষাচয়ন প্রকাশনের সাহিত্যযাত্রায় একটি স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে রইল। কবি-সাহিত্যিকদের সম্মান, নতুন প্রতিভার উৎসাহ এবং সৃষ্টিশীলতার পাশে থাকার এই উদ্যোগ আগামী দিনেও অব্যাহত থাকবে—এই প্রত্যাশাতেই অনুষ্ঠানের পরিসমাপ্তি ঘটে।