শুরুতেই শনাক্ত করুন: হেড এন্ড নেক ক্যানসারের প্রাথমিক লক্ষণ ও ঘরে বসে সহজ পরীক্ষা…
ডাঃ এস.এল.এন. চন্দ্র মোহনঅ্যাসোসিয়েট কনসালটেন্ট – হেড এন্ড নেক অঙ্কোলজি, নারায়ণা হাসপাতাল, বারাসাতহেড এন্ড নেক ক্যানসার (Head and Neck Cancer বা HNC) অনেক সময় খুবই নিঃশব্দে শুরু হয়। এর প্রাথমিক লক্ষণগুলি এমন হতে পারে, যা রোগী প্রথমে গুরুত্বই দেন না। কিন্তু এই লক্ষণগুলিকে সময়মতো চিনে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।অনেকেই নিয়মিতভাবে মুখ, গলা বা ঘাড় পরীক্ষা করেন না। অথচ কয়েকটি সহজ ও নিয়মিত স্ব-পরীক্ষার মাধ্যমে গুরুতর হওয়ার আগেই সম্ভাব্য সতর্কসংকেত ধরা পড়তে পারে।সাম্প্রতিক গবেষণা অনুযায়ী, ভারতে পুরুষদের মধ্যে মোট ক্যানসারের প্রায় ২৬% এবং মহিলাদের মধ্যে প্রায় ৮% ক্ষেত্রে হেড এন্ড নেক ক্যানসার দেখা যায়। এছাড়া, পুরুষদের ক্ষেত্রে এই ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা প্রতি ৩৩ জনে ১ জন, এবং মহিলাদের ক্ষেত্রে প্রতি ১০৭ জনে ১ জন।হেড এন্ড নেক ক্যানসারের মধ্যে মুখগহ্বর, গলা, নাকের অভ্যন্তরীণ অংশ, স্বরযন্ত্র (লারিংস) এবং লালাগ্রন্থির ক্যানসার অন্তর্ভুক্ত। ভারতে এই ধরনের ক্যানসার এখনও অত্যন্ত সাধারণ। এর প্রধান কারণ তামাক ও অ্যালকোহল সেবন, যদিও বর্তমানে হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস (HPV)-এর সংক্রমণও একটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকির কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। ভারতে মুখের ক্যানসারে আক্রান্ত প্রায় ৮০–৯০% রোগীর ক্ষেত্রে তামাক সেবনের ইতিহাস পাওয়া যায়, এবং বিশ্বে মুখগহ্বরের ক্যানসারের রোগীর সংখ্যার দিক থেকে ভারত শীর্ষস্থানে রয়েছে।এই ক্যানসারের বেশ কিছু প্রাথমিক লক্ষণ সহজেই চোখে পড়তে পারে। যেমন:মুখের ঘা, যা দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে সারছে নামুখের ভিতরে সাদা বা লাল দাগএকদিকে অকারণ কানে ব্যথাগাল বা ঘাড়ে অস্বাভাবিক গাঁট বা শক্ত হয়ে যাওয়া অংশতিন সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে কণ্ঠস্বর ভাঙা বা কর্কশ হয়ে থাকাখাবার গিলতে অসুবিধা বা গলায় কিছু আটকে থাকার অনুভূতিদীর্ঘস্থায়ী গলা ব্যথাহঠাৎ ওজন কমে যাওয়ামুখের কোনও অংশে অসাড়তাএই ধরনের যে কোনও লক্ষণ দেখা দিলে অবশ্যই দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।চিকিৎসকেরা বাড়িতেই একটি সহজ স্পরীক্ষা করার পরামর্শ দেন। ভালো আলোতে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ঠোঁট, মাড়ি, গালের ভেতরের অংশ, জিভ, জিভের নিচের অংশ, মুখের উপর ও তলার অংশ ভালোভাবে দেখে নিন। কোথাও ঘা, রঙের পরিবর্তন বা অস্বাভাবিকতা রয়েছে কি না লক্ষ্য করুন। এরপর চোয়ালের নিচ থেকে কলারবোন পর্যন্ত ঘাড়ের দুই পাশ আলতোভাবে হাত বুলিয়ে দেখুন, কোনও গাঁট বা শক্ত অংশ অনুভূত হচ্ছে কি না। পাশাপাশি নিজের কণ্ঠস্বরের পরিবর্তন এবং খাবার গিলতে কোনও সমস্যা হচ্ছে কি না, সেদিকেও নজর রাখুন। যদি তিন সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে কণ্ঠস্বর কর্কশ থাকে বা গলায় কিছু আটকে থাকার অনুভূতি বারবার হয়, তাহলে তা অবহেলা করবেন না।যদি কোনও সতর্কসংকেত দুই থেকে তিন সপ্তাহের বেশি সময় ধরে থেকে যায়, তাহলে দ্রুত একজন ইএনটি (ENT) বিশেষজ্ঞ বা ওরাল সার্জনের সঙ্গে যোগাযোগ করা উচিত। সময়মতো চিকিৎসা, প্রয়োজনীয় ইমেজিং পরীক্ষা এবং বায়োপসির মাধ্যমে রোগটি প্রাথমিক পর্যায়েই শনাক্ত করা গেলে চিকিৎসা অনেক বেশি কার্যকর হয়, চিকিৎসার জটিলতা কমে এবং রোগীর জীবনযাত্রার মান উন্নত থাকে।প্রাথমিক শনাক্তকরণের পাশাপাশি প্রতিরোধও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তামাক ও অ্যালকোহল সেবন কমানো বা সম্পূর্ণ বর্জন করা, উপযুক্ত বয়সে কিশোর-কিশোরীদের HPV টিকা দেওয়া এবং নিয়মিত দাঁতের ও স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো হেড এন্ড নেক ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।বিশ্ব হেড এন্ড নেক ক্যানসার দিবস উপলক্ষে নারায়ণা হাসপাতাল, বারাসাত সকলকে অনুরোধ করছে— হেড এন্ড নেক ক্যানসারের প্রাথমিক লক্ষণ সম্পর্কে সচেতন হোন, নিয়মিত সহজ স্ব-পরীক্ষা করুন এবং কোনও লক্ষণ দীর্ঘদিন ধরে থাকলে দেরি না করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। কারণ, সময়মতো পদক্ষেপই জীবন বাঁচাতে পারে।